পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নজিরবিহীন বিজয় - ভোটার তালিকা বিতর্ক ও গণতন্ত্র নিয়ে নতুন উদ্বেগ!
পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত, বাতিল বা যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। অভিযোগ উঠেছে, মুসলিম, অভিবাসী শ্রমিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে এই প্রক্রিয়ায় আনা হয়
আল জাজিরার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ডেস্ক রিপোর্টঃ ভারতের সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচন দেশটির সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ১০ কোটিরও বেশি মানুষের আবাস পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী -এর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
ঘোষিত ২৯৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি জয় পেয়েছে ২০৭টিতে। অপরদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এর দল তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৮০টি আসন। একটি আসনে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে এই বিজয়ের পাশাপাশি ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন “স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন” বা এসআইআর নামে ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনার একটি বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনা করে। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি মৃত, ডুপ্লিকেট বা “অযোগ্য” ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত, বাতিল বা যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। অভিযোগ উঠেছে, মুসলিম, অভিবাসী শ্রমিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে এই প্রক্রিয়ায় অসমভাবে টার্গেট করা হয়েছে—বিশেষত যেসব এলাকায় অতীতে বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি জয়ী হওয়া অনেক আসনে বাদ পড়া বা বিতর্কিত ভোটারের সংখ্যা জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি ছিল। ফলে বিরোধীরা দাবি করছে, এটি কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগ ছিল না; বরং বৃহৎ পরিসরে ভোটাধিকার খর্ব করার একটি রাজনৈতিক কৌশল।
ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি সংবেদনশীল সীমান্তবর্তী অঞ্চল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ধর্মীয় বিভাজনের স্মৃতি এখনও রাজ্যের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা এই রাজ্যে মুসলিম জনগোষ্ঠীর হার প্রায় ২৭ শতাংশ, যারা দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগতভাবে বিজেপিবিরোধী ভোট দিয়ে এসেছে।
২০২১ সালের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পরাজিত হওয়ার পর ২০২৬ সালের নির্বাচনকে বিজেপির জন্য মর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়।
এসআইআর কার্যক্রম প্রথম শুরু হয় বিহারে ২০২৫ সালের জুনে। পরে তা পশ্চিমবঙ্গসহ নয়টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে সম্প্রসারণ করা হয়। ভোটারদের স্বল্প সময়ের মধ্যে নথিপত্র দেখিয়ে নিজেদের যোগ্যতা পুনঃপ্রমাণ করতে বলা হয়। ব্যর্থ হলে নাম বাদ দেওয়ার ঝুঁকি ছিল।
সমালোচকদের মতে, ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভোটারদের ওপর নিজেদের ভোটাধিকার প্রমাণের দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা গণতান্ত্রিক চুক্তির একটি বিপজ্জনক পরিবর্তন।
অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বহু মানুষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজ এলাকায় ফিরতে পারেননি। আবার নামের বানান ভুল, পুরোনো নথির অভাব কিংবা বিবাহের পর নাম পরিবর্তনের মতো কারণে অসংখ্য নারী ও দরিদ্র মানুষ জটিলতার মুখে পড়েন।
বিজেপি এই উদ্যোগকে “অবৈধ অনুপ্রবেশকারী” শনাক্তের পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরে, বিশেষ করে বাংলাদেশি মুসলিম অভিবাসীদের প্রসঙ্গ সামনে আনে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কয়েকবার হস্তক্ষেপ করলেও শেষ পর্যন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। ভোটগ্রহণের আগে প্রায় ৩৪ লাখ আপিল ঝুলে ছিল, যার মধ্যে মাত্র দুই হাজারের কম নিষ্পত্তি হয়।
চূড়ান্ত হিসাবে প্রায় ২৭ লাখ ভোটারের নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে। নির্বাচনে বিজেপি পায় প্রায় ২ কোটি ৯২ লাখ ভোট, যা তৃণমূলের চেয়ে প্রায় ৩২ লাখ বেশি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ফলাফল ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে নতুন এক বাস্তবতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তারা বলছেন, সীমান্ত পুনর্নির্ধারণ, “ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন” নীতি এবং ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম—সব মিলিয়ে ভারতের রাজনৈতিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ ও প্রশাসনিক প্রভাবের সমন্বয়ে ভারতের বহুত্ববাদী গণতন্ত্র ক্রমেই সংকুচিত হয়ে একটি কেন্দ্রীয়কৃত সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।



