যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির মার্বেল হিল এলাকায় পাঁচ বছরের এক শিশুর উপস্থিতিতে গুলি চালিয়েছেন ফেডারেল ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কর্মকর্তারা। এতে অস্কার বেলগাল (২৮) নামে ডোমিনিকান রিপাবলিকের এক নাগরিক আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেল ৪টার দিকে ব্রঙ্কসের মার্বেল হিল অ্যাভিনিউ ও ওয়েস্ট ২২৫তম স্ট্রিটের কাছাকাছি এ ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তি একটি গাড়িতে ছিলেন, যার পেছনের আসনে বসা ছিল পাঁচ বছরের একটি শিশু। শিশুটি শারীরিকভাবে অক্ষত রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (এনওয়াইপিডি)।
সাতটি গুলি ছোড়ার তথ্য
নিউইয়র্কের পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আইসিই কর্মকর্তারা ওই ব্যক্তিকে ফেডারেল অভিবাসন হেফাজতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অভিযান চালাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি একটি ধূসর রঙের হোন্ডা সিআর-ভি গাড়িতে ছিলেন। সাদা পোশাকের দুই ফেডারেল কর্মকর্তা গাড়িটির চালকের পাশের দিকে এগিয়ে যান। তাঁদের একজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গাড়িটি সামনে এগিয়ে যাওয়ার পর অন্তত একজন আইসিই কর্মকর্তা সাতটি গুলি ছোড়েন। এর মধ্যে একটি গুলি চালকের বাঁ কানের নিচে, ঘাড়ের অংশে লাগে। ঘটনাস্থলে অন্তত সাতটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। গাড়িটির সামনের উইন্ডশিল্ডে গুলির চিহ্ন এবং পেছনের কাচ ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়।
আহত ব্যক্তিকে প্রথমে নিউইয়র্ক-প্রেসবিটারিয়ান অ্যালেন হাসপাতালে নেওয়া হয়। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁকে হাসপাতাল থেকে একটি নম্বরবিহীন গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে মেয়র জোহরান মামদানি জানান।
শিশুটিকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর
ঘটনার সময় গাড়ির পেছনের আসনে থাকা পাঁচ বছরের শিশুটি আহত ব্যক্তির ছেলে বলে ধারণা করছে পুলিশ। পরে শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এনওয়াইপিডি একটি সুস্থতা যাচাই কার্যক্রম পরিচালনা করে। এতে শিশুটিকে নিরাপদ অবস্থায় পাওয়া যায় এবং পরিবারের এক সদস্যের তত্ত্বাবধানে দেওয়া হয়।
ঘটনার সময় এলাকায় স্কুল ছুটির পর পরিবার ও শিশুদের চলাচল ছিল বলে জানান মেয়র মামদানি। তাঁর মতে, আবাসিক এলাকায় এ ধরনের অভিযান জননিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে মামদানির আলোচনা ব্যর্থ
ঘটনার পর নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আহত ব্যক্তিকে ফেডারেল হেফাজত থেকে মুক্ত করার বিষয়ে কয়েক ঘণ্টা আলোচনা হলেও তা সফল হয়নি বলে জানান তিনি।
মামদানির দাবি, আলোচনা চলাকালেই ফেডারেল কর্মকর্তারা আহত ব্যক্তিকে একটি নম্বরবিহীন গাড়িতে করে নিয়ে যান। এ ঘটনায় আইসিইর অভিযান বন্ধের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে নিউইয়র্কের আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল ও রাস্তায় আইসিইর কার্যক্রম নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন মেয়র।
ফেডারেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, অপরাধের পূর্ব ইতিহাস রয়েছে এমন একজন ডোমিনিকান নাগরিককে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে আইসিই কর্মকর্তারা ‘টার্গেটেড এনফোর্সমেন্ট অপারেশন’ পরিচালনা করছিলেন। বিভাগটির দাবি, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগে গুরুতর চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ ও মামলা রয়েছে।
ফেডারেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় গাড়ি ও কর্মকর্তাদের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং গাড়িটি আইসিইর যানবাহনে আঘাত করেছিল। এ পরিস্থিতিতে একজন কর্মকর্তা গুলি চালান বলে তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কর্মকর্তারাই আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন বলেও দাবি করেছে বিভাগটি।
তবে গুলি চালানোর প্রয়োজনীয়তা, ঘটনার সময় গাড়ির সুনির্দিষ্ট গতিবিধি এবং কর্মকর্তাদের বলপ্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে স্বাধীন তদন্তের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ঘটনাস্থলে এনওয়াইপিডির ভূমিকা
পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, গুলি চালানোর আগে ফেডারেল অভিযানে এনওয়াইপিডির কোনো সদস্য অংশ নেননি। গুলির ঘটনা ঘটার সময়ও শহরের পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না।
পরে এনওয়াইপিডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রমাণ সংগ্রহ ও এলাকা সুরক্ষিত করেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট গাড়িগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তদন্ত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর নিউইয়র্কে অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযান এবং আইসিইর বলপ্রয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে ঘটনাটির প্রতিবাদে বিক্ষোভও হয়। হাসপাতাল এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির খবর পাওয়া গেছে।
নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোচুলও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস বলেন, ঘটনার সব তথ্য নিরপেক্ষভাবে প্রকাশ করা জরুরি। আহত ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি তদন্তের স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দেন।
এদিকে, আহত ব্যক্তির হেফাজত, অভিযানের প্রকৃত পরিস্থিতি এবং গুলি চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ফেডারেল কর্তৃপক্ষের দাবি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় তদন্তের ফলকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গুলি চালানোর সব পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে পাঁচ বছরের একটি শিশুর উপস্থিতিতে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের ঘটনা নিউইয়র্কে অভিবাসন আইন প্রয়োগের পদ্ধতি ও জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।



