ডেস্ক রিপোর্টঃ ১৩ অক্টোবর ২০২৬
মার্কিন কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমরের ওয়াশিংটন ডিসির বাড়িতে সোমবার সকালে ফেডারেল এজেন্টরা তল্লাশি চালিয়েছেন। দুটি সূত্রের বরাতে এপি জানিয়েছে, তল্লাশিটি একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ। ডেমোক্র্যাট এই কংগ্রেস সদস্য ঘটনাটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে অভিযোগ করেছেন। এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।
মার্কিন বিচার বিভাগ এক বিবৃতিতে জানায়, Homeland Security Investigations (HSI)-এর এজেন্টরা বিচার বিভাগের সংগৃহীত একটি আদালত-অনুমোদিত সার্চ ওয়ারেন্ট কার্যকর করেছেন। বিভাগের ভাষায় এটি “চলমান ফেডারেল ফৌজদারি তদন্তের” অংশ, তবে এর বাইরে কোনো বিবরণ দেওয়া হয়নি। বিবৃতিতে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়নি যে ওয়ারেন্টটি ওমরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে ওমর নিজেই তল্লাশির কথা নিশ্চিত করেছেন।
ঘটনা সম্পর্কে যা জানা গেছেঃ
এনপিআর জানিয়েছে, ওমরের বাড়ির উল্টোদিকের এক প্রতিবেশী বলেছেন, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে এজেন্টদের কারণে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। সোমবার সকালে রাস্তাটি বন্ধ ছিল এবং HSI এজেন্টরা বাড়ির কাছেই অবস্থান করছিলেন।
তদন্তের প্রকৃতি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে বিস্তারিত বলা হয়নি, তবে সংবাদমাধ্যমে কিছু তথ্য এসেছে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচার বিভাগের এক মুখপাত্র চলমান ফৌজদারি তদন্তের কথা নিশ্চিত করেছেন। Fox News জানিয়েছে, তল্লাশিটি ওমরের অভিবাসন-সংক্রান্ত কাগজপত্রে জালিয়াতির তদন্তের সঙ্গে যুক্ত। সরকার এই অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ বা প্রমাণ প্রকাশ করেনি।
ওমর সোমালিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। গৃহযুদ্ধের কারণে তিনি ৮ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে সোমালিয়া ছাড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে চার বছর কেনিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে কাটান। ২০০০ সাল থেকে তিনি মার্কিন নাগরিক। তিনি মিনেসোটার ৫ম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি।
তল্লাশিটি আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। এর আগে থেকেই ওমরকে ঘিরে প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে বিতর্ক চলছিল। ওমর জানিয়েছিলেন, ৬ আগস্ট রিচফিল্ডে তাঁর টাউন হল সভার বাইরে একটি আন্ডারকভার HSI এজেন্ট ছিলেন, এবং তিনি এজেন্সির কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছিলেন। সেপ্টেম্বরে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েন মালিন বলেন, ওমরের অভিবাসন-ইতিহাস এবং ভাইকে বিয়ে করার বিতর্কিত অভিযোগ নিয়ে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। DHS-এর এক মুখপাত্র নির্দিষ্ট তদন্তে মন্তব্য করতে অস্বীকার করে বলেন, কংগ্রেস সদস্যসহ কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সও আগে ওমরের বিরুদ্ধে অভিবাসন জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন। ওমর এসব অভিযোগ বরাবর অস্বীকার করে আসছেন।
ট্রাম্পের বিষেধাগারঃ
এই পটভূমিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের প্রকাশ্য আক্রমণও আলোচনায় এসেছে। এবিসি অস্ট্রেলিয়া লিখেছে, ওমর ট্রাম্পের রাজনৈতিক অপমানের বারবার লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন, এবং ট্রাম্প সোমালি-আমেরিকান সম্প্রদায়কে মিনেসোটার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে সোমালি-বিরোধী ও মুসলিম-বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। গত বছরের শেষদিকে এক ক্যাবিনেট বৈঠকে ট্রাম্প ওমরকে “আবর্জনা” (garbage) বলেন এবং সোমালিদের “যেখান থেকে এসেছে সেখানে ফিরে যাওয়ার” কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ওমরের কংগ্রেসওম্যান থাকা উচিত নয়। তাঁর সমর্থকেরা ওমরকে সোমালিয়ায় “ফেরত পাঠানোর” স্লোগান দিলে তিনি তা থামাননি। মিনেসোটার স্থানীয় নেতারা এসব মন্তব্যকে বর্ণবাদী, ইসলামবিদ্বেষী ও বিদেশিবিদ্বেষী বলে নিন্দা করেছেন।
পরবর্তী মাসগুলোতেও আক্রমণ থামেনি। আরেক ক্যাবিনেট বৈঠকে ট্রাম্প সোমালি অভিবাসীদের “সবাই প্রতারক” বলেন এবং ওমরকে “ভয়ংকর রকম দুর্নীতিবাজ” (crooked as hell) আখ্যা দেন। এনবিসি লিখেছে, ওমরের বিরুদ্ধে ঠিক কোন অভিযোগ তিনি করছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। পেনসিলভানিয়ার এক বক্তৃতায় ট্রাম্প ওমরের নাম ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল উচ্চারণ করেন বলে মনে হয়েছে, এবং ওমরের হিজাবকে পাগড়ি বলে উল্লেখ করেন। একই বক্তৃতায় তিনি সোমালিয়াকে “নোংরা” ও “অপরাধে ভরা” বলে বর্ণনা করেন এবং ইঙ্গিত দেন যে ওমর অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। ডেইলি বিস্টের বরাতে জানা যায়, জানুয়ারিতে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প ওমরকে “প্রতারক” (scammer) বলেন এবং লেখেন যে তাঁর ও সোমালিয়ার বন্ধুদের জেলে থাকা উচিত, নয়তো “আরও কঠোর” কিছু হওয়া উচিত। তল্লাশির মাত্র দুদিন আগে, শনিবার টেনেসির এক সমাবেশে ট্রাম্প আবার ওমর ও সোমালিয়াকে নিশানা করেন। তিনি সোমালিয়া সম্পর্কে বলেন, সেখানে শুধু “অপরাধ আর দারিদ্র্য” আছে। উপস্থিত জনতা ওমরের প্রসঙ্গে হুররে করে ওঠে।
ওমর এসব মন্তব্যের জবাবে বারবার ট্রাম্পের আচরণকে অস্বাভাবিক বলেছেন। তিনি ট্রাম্পের তাঁর প্রতি মনোযোগকে “অস্বাস্থ্যকর ও ভীতিকর আসক্তি” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। জানুয়ারিতে এক টাউন হলে তাঁর ওপর হামলার ঘটনার জন্য তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যকেও আংশিকভাবে দায়ী করেছেন।
ট্রাম্পের আক্রমণের একটি প্রেক্ষাপট আছে। মিনেসোটায় Feeding Our Future নামের সংস্থাকে ঘিরে প্রায় ২৫ কোটি ডলারের জালিয়াতি মামলায় অভিযুক্তদের বেশিরভাগই সোমালি বংশোদ্ভূত, যা ট্রাম্প বারবার তুলে ধরেছেন। তবে ওমর ওই কেলেঙ্কারিতে কোনো অন্যায়ের অভিযোগে অভিযুক্ত নন।
ইলহান ওমরের প্রতিক্রিয়াঃ
তল্লাশির পর ওমর সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রচেষ্টা।” তিনি একে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের “রাজনৈতিক ভীতি প্রদর্শনের অভিযানের” সর্বশেষ ধাপ বলেছেন। তাঁর মুখপাত্র জ্যাকলিন রজার্স একে “ক্ষমতার ঘৃণ্য অপব্যবহার” বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে, তল্লাশির বিষয়ে আগে থেকে জানতেন কি না, জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, কর্তৃপক্ষ ওমরকে “খুব সতর্কভাবে” খতিয়ে দেখছে।
সামনে কি হতে পারেঃ
আইনি দিক থেকে মনে রাখা জরুরি যে, সার্চ ওয়ারেন্ট কার্যকর হওয়া মানে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। ওয়ারেন্ট পেতে বিচারকের কাছে “সম্ভাব্য কারণ” দেখাতে হয়, যা অভিযোগপত্র বা দোষী সাব্যস্ত হওয়া থেকে আলাদা। অপরাধ প্রমাণের দায় আদালতে সরকারের ওপর বর্তায়। ওয়ারেন্টের সঙ্গে যুক্ত হলফনামা সিল করা থাকলে তদন্তের ভিত্তি সহজে জানা যাবে না। একইভাবে, প্রেসিডেন্টের অবমাননাকর মন্তব্য নিজে থেকে তদন্ত অবৈধ বা বৈধ, কোনোটিরই প্রমাণ নয়। তবে ওমরের সমর্থকদের যুক্তি, এসব মন্তব্য তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয়ের পটভূমি তৈরি করে।
সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তল্লাশিটি ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের রীতি অনুযায়ী নির্বাচনের আগে এমন পদক্ষেপে বাড়তি সতর্কতা প্রত্যাশিত, যাতে কোনো প্রার্থী বা দলকে সুবিধা বা অসুবিধায় ফেলার ধারণা তৈরি না হয়। তবে নির্বাচনের নির্দিষ্ট দিন আগে তদন্ত নিষিদ্ধ করে, এমন কোনো বাধ্যতামূলক আইন নেই। “৬০ দিনের নিয়ম” নামে পরিচিত বিষয়টি মূলত একটি অলিখিত রীতি। ফলে সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলা ন্যায্য হলেও শুধু সময় দেখে উদ্দেশ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে কংগ্রেস সদস্যের বিরুদ্ধেও তদন্ত বৈধ এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু ওমরের প্রতি প্রশাসনের দীর্ঘদিনের প্রকাশ্য বৈরিতা এবং আগস্টের আন্ডারকভার এজেন্ট বিতর্কের পটভূমিতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তদন্তের বিষয়বস্তু সম্পর্কে যা প্রকাশিত হয়েছে, তার প্রায় সবই নামহীন সূত্র বা একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদননির্ভর। তাই এসব তথ্যকে নিশ্চিত হিসেবে গ্রহণ করা যাচ্ছে না।
সামনে কী ঘটবে, তা এখনও অনিশ্চিত। বিচার বিভাগ অভিযোগ আনতে পারে, আবার কোনো পদক্ষেপ ছাড়াও তদন্ত শেষ হতে পারে। ওমরের আইনজীবীরা তল্লাশির বৈধতা বা জব্দ করা সামগ্রী নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। কংগ্রেসেও ঘটনাটির তদারকি নিয়ে উদ্যোগ আসতে পারে। এগুলো সম্ভাব্য পথ মাত্র, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়।



