ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে হাত মিলিয়েছেন আহমাদিনেজাদ? — নিউইয়র্ক টাইমসের বিস্ফোরক প্রতিবেদন
যুদ্ধের প্রথম দিন তেহরানে তার বাসভবনে চালানো হামলার উদ্দেশ্য ছিল তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা। হামলায় তিনি আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান। তবে ওই ঘটনার পর পরিকল্পনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন আহমাদিনেজাদ ।
ওয়াশিংটন/তেহরান, ২০ মে: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছিল বলে বিস্ফোরক এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরুতেই আহমাদিনেজাদকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে তার বাড়িতে ইসরায়েলি হামলাও চালানো হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন যে, “ইরানের ভেতর থেকেই কেউ” দেশটির নেতৃত্ব নিলে সেটিই ভালো হবে। পরবর্তীতে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিকল্পনায় সেই “কেউ” ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ।
একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা ও আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ এক সহযোগীর দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিন তেহরানে তার বাসভবনে চালানো হামলার উদ্দেশ্য ছিল তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা। হামলায় তিনি আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান। তবে ওই ঘটনার পর তিনি তথাকথিত “রেজিম চেঞ্জ” পরিকল্পনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর থেকে আহমাদিনেজাদকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তার বর্তমান অবস্থান কিংবা শারীরিক অবস্থার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
আহমাদিনেজাদ ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি তার কট্টর ইসরায়েলবিরোধী ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্যের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত ছিলেন। “ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে হবে” — এমন বক্তব্যের জন্যও তিনি ব্যাপক সমালোচিত হন। একইসঙ্গে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির শক্ত সমর্থক ছিলেন এবং ভিন্নমত দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তিনি দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করেন এবং ২০১৭, ২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেও ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল তার প্রার্থিতা বাতিল করে দেয়। ধীরে ধীরে তাকে সীমিত চলাফেরার মধ্যে রাখা হয় এবং কার্যত গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের দাবি, ইসরায়েলের বহুস্তরীয় পরিকল্পনার অংশ ছিল ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তন। পরিকল্পনায় প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা, শীর্ষ নেতাদের হত্যা এবং কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করার কথা ছিল। দ্বিতীয় ধাপে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে সরকারকে দুর্বল করা এবং তৃতীয় ধাপে “বিকল্প সরকার” প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়।
তবে বাস্তবে পরিকল্পনার বড় অংশই ব্যর্থ হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের সরকার টিকে যায় এবং প্রত্যাশিত অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহও দেখা যায়নি।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, “অপারেশন এপিক ফিউরির লক্ষ্য ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সামরিক অবকাঠামো ও নৌ সক্ষমতা ধ্বংস করা।” তবে তিনি নেতৃত্ব পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি।
এদিকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠদের কেউ কেউ অতীতে পশ্চিমা দেশ ও ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি হাঙ্গেরি ও গুয়াতেমালাসহ কয়েকটি দেশে সফর করেন, যা নিয়েও ইরানে নানা জল্পনা তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই প্রতিবেদন সত্য হয়ে থাকে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরাননীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলতে পারে। একইসঙ্গে এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতি সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।



