জীবন-মৃত্যুর আলোছায়ায় আওয়ামী লীগের তোফায়েল
গলা নামিয়ে বললেন, ‘তোমাদের চেয়েও খারাপ।’ আমি তীক্ষ্ণ চোখে চাইলাম তার দিকে। অল্পকথায় তিনি তার প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলার বিবরণ দিয়ে বললেন, ‘বঙ্গভবনের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও অনেক সময় আমাকে দাওয়াত দেওয়া হয় না'
(দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক ও বেগম খালেদা জিয়ার প্রাত্তন প্রেস সচিব মারুফ কামাল খানের লেখা সম্পাদকীয় যা গত ২৬ মে পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হয়েছে)
গত বছরের শেষ প্রান্তিকে রটে গিয়েছিল যে, তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন। সেসময় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই প্রবীণ রাজনীতিবিদকে যান্ত্রিক সহায়তা বা লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। এই পর্বে বেশ কয়েকবার তার মৃত্যুর গুজব ছড়ায় এবং কতিপয় মিডিয়াও গুজব-প্রভাবিত সেই ভুল তথ্য সংবাদ আকারে প্রচারও করে। সে-সকল গুজবকে অসার করে তার নিঃসাড় দেহে প্রাণের অস্তিত্ব এখনও বিরাজমান। তার বয়স এখন ৮২ পেরিয়েছে। হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকতেই তার বিয়েবার্ষিকী উদযাপন করা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে। আর এর অল্প কিছুদিন পরেই স্ত্রীবিয়োগ ঘটে তোফায়েল আহমেদের। নভেম্বরে হঠাৎ করেই মারা যান আনোয়ারা বেগম। এই দম্পতির একমাত্র কন্যাসন্তান তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী। চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি থাকলেও মুন্নী ডাক্তারি করেন না। তার স্বামী তৌহিদুজ্জামান তুহিন স্কয়ার হাসপাতালে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। এ ছাড়া তোফায়েল আহমেদ তার বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার ছোট ছেলে মাইনুল হোসেন বিপ্লবকে দত্তক নিয়ে পুত্রবৎ স্নেহে লালন পালন করে বড় করেছেন।
দক্ষিণের দ্বীপাঞ্চল ভোলার এক অতি সাধারণ পরিবেশ থেকে উঠে আসা তোফায়েল আহমেদ স্বীয় যোগ্যতা ও দক্ষতা বলে রাজনৈতিক সংগ্রাম, দল ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিজেকে উন্নীত করতে পেরেছেন। জনসমাজে তিনি ‘আওয়ামী লীগের তোফায়েল’ হিসেবে সুপরিচিত। বর্তমানে সরকারি আদেশে এই রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। এই দলের সহযোগী সংগঠন বর্তমানে নিষিদ্ধ-ঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পাকিস্তানি শাসনামলে রাজনীতি শুরু করে তিনি ওই সংগঠনের শীর্ষ পদ পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। ছাত্রলীগের মনোনয়নে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয়ে ‘ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনিই ওই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের (তখনকার নাম রেসকোর্স ময়দান) এক মস্ত জনসভায় আওয়ামী লীগের কারামুক্ত শীর্ষ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাব দেন।
সে-সময়কার ছাত্রলীগের চারজন নেতাকে শেখ মুজিবের ‘চার খলিফা’ নামে ডাকা হতো। তারা হলেনÑ নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, আব্দুল কুদ্দুস মাখন ও শাজাহান সিরাজ। তাদের ওপর ‘সুপার চার খলিফা’ বলে পরিচিত চারজনের একজন ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। বাকি তিনজন ছিলেনÑ শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান ও আব্দুর রাজ্জাক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে অগ্রসর করে নেওয়ার ক্ষেত্রে এদের সকলের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তারা সকলে ভারতে গিয়ে সে-দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার তদারকিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সমান্তরালে বেঙ্গল লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) গঠনে নেতৃত্ব দেন। এই বিএলএফ ‘মুজিব বাহিনী’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল।
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করলে তোফায়েল আহমেদ অতি অল্প বয়সেই প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব নিযুক্ত হন। সিভিল সার্ভিসের আওয়ামীকরণে তিনি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং তখনকার নিয়োগপ্রাপ্তরা ‘তোফায়েল ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিতি পান। বিতর্কিত ‘রক্ষীবাহিনী’ও অলিখিতভাবে তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক নির্দেশনার আওতাধীন ছিল এবং পঁচাত্তরের রক্তক্ষয়ী পটপরিবর্তনে মোকাবিলায় প্রত্যাশিত ভূমিকা না-রাখার ব্যাপারে তিনি নিজ দলে সমালোচিত হন।
স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা-পর্বেই একদলীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার কারণে ধিকৃত আওয়ামী লীগকে ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে পুনর্গঠিত ও পুনরুত্থিত করতে তোফায়েল আহমেদ বিরাট ভূমিকা পালন করেন। তার যোগাযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও বাগ্মিতা আওয়ামী লীগকে দ্রুতই শক্তি জোগায়। তবে ভারত-প্রবাসী মুজিব-কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকে তোফায়েল আহমেদ তার দলের শীর্ষনেত্রীর সুদৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেননি। ছাত্রলীগের শীর্ষপদে থাকতে তোফায়েল আহমেদ শেখ হাসিনাকে ওই সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দেননি বলে আ.লীগ সভানেত্রী প্রকাশ্য সভায় অভিযোগ করেছিলেন। এ ছাড়াও সুযোগ পেলেই তিনি তার বক্তব্যে তোফায়েল আহমেদের প্রতি কটাক্ষ করে শ্লেষাত্মক মন্তব্য করতেন। ২০০৭ সালে ‘এক-এগারো’ নামে সেনাসমর্থিত সরকার রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে ‘মাইনাস’ করার যে উদ্যোগ নেয় তাতে আরও অনেকের সঙ্গে তোফায়েলেরও সায় ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। আওয়ামী লীগের এই মাইনাসপন্থী নেতাদের নামের ইংরেজি বানানের আদ্যাক্ষর মিলিয়ে শেখ হাসিনা তাদেরকে RATS হিসেবে অভিহিত করতেন। এই র্যাটস-এর বাংলা অর্থ ইঁদুরসমূহ এবং হাসিনা-কথিত সেই ইঁদুরেরা ছিলেনÑ রাজ্জাক, আমু, তোফায়েল ও সুরঞ্জিত।
এক-এগারোর পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর তাদেরকে বাধ্য হয়ে হাসিনার সংগে ‘হবনবিং’ করতে হয়। নিয়ন্ত্রিত এক নির্বাচনী মহড়ার মাধ্যমে হাসিনার হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা তুলে দিয়ে এক-এগারোর প্রধান কুশীলবরা তাদের নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করেন। বিজয়িনীর বেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হাসিনা তার কথিত র্যাটস গোষ্ঠীর কার্যকলাপ ‘ফরগিভ’ করলেও ‘ফরগেট’ করবেন না বলে ঘোষণা দেন। ক্ষমা করলেও মনে রাখার সেই কৌশলের প্রয়োগ শুরু হলে তোফায়েল আহমেদ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য পদে অবনমিত হন। এক সময় তাকে মন্ত্রী না করে প্রতীক্ষায় বা ওয়েটিংয়ে রাখা হয়। পরে তাকে ফের মন্ত্রিত্ব অফার করলে অভিমানী তোফায়েল তা গ্রহণে অস্বীকার করেন। বিরোধী দলের আন্দোলনে হাসিনার মসনদ টলায়মান হয়ে উঠলে আওয়ামী লীগের তখনকার ভারতীয় মুরুব্বি প্রণব মুখার্জির অনুরোধে তোফায়েল আহমেদ ফের নিজেকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি হন। তখন ভারতীয় স্বার্থরক্ষায় হাসিনার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনের কাছে আরেকবার নিজেকে সমর্পিত করতে হয় তোফায়েল আহমেদকে।
হাসিনার বিরূপ মনোভাব সত্ত্বেও তার নেতৃত্ব নিরঙ্কুশ করতে তোফায়েল আহমেদ বিভিন্ন সময়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেও তার মন পাননি। হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মাধ্যমে এরশাদের জাতীয় পার্টিকে পুরোপুরি আওয়ামীবলয়ে নিয়ে আসেন তোফায়েল। জামায়াত নেতাদের ফাঁসির দাবিতে তথাকথিত ‘গণআদালত’ বসানোর অন্যতম উদ্যোক্তা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের গাঁটছড়া বাঁধার পেছনের কলকাঠিও নেড়েছিলেন তিনি। এর সূচনা হয়েছিল তোফায়েল আহমেদের একটি পাব্লিক স্টেটমেন্টের মাধ্যমে। তিনি বলেছিলেন : ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা। আমি তা অস্বীকার করব কেমন করে?’ এরপর আওয়ামী লীগ দ্রুত জামায়াতের তখনকার আমির গোলাম আযমের ‘জাতীয় নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকার’ তত্ত্ব রাজনৈতিক দাবি হিসেবে গ্রহণ করে এবং বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আ.লীগ-জাপা-জামায়াত মিলে দেশব্যাপী সহিংস আন্দোলন শুরু করে।
২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ-তারানকো এক সমঝোতা মিশনে সক্রিয় হন। তার মধ্যস্থতায় বিবদমান দলগুলো আলাপে বসে। দফায় দফায় বৈঠকের পর বিরোধী দলের অনেক দাবি মেনে নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ফয়সালার ব্যাপারে রাজি হয়। এরপর আচানক সে বৈঠকে এসে যোগ দেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি আওয়ামী পক্ষের প্রধান আলোচক এবং দলটির তখনকার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফকে বিরোধী দলের দাবি মেনে নেওয়ায় তীব্র ভর্ৎসনা করেন। তিনি বলেন, ‘পলিটিক্স এত সোজা নয়। অ্যামেচার দিয়ে রাজনীতি হয় না।’ তোফায়েল আহমেদ সব সমঝোতা উল্টে দিয়ে বলেন, ‘এখন সময় নাই। বিরোধী দল আসুক বা না আসুক সংবিধান রক্ষায় নির্বাচন করে ফেলতে হবে। পরে সময় নিয়ে আলোচনা করে ফয়সালায় পৌঁছা সম্ভব হলে ফের নির্বাচন করা যাবে।’
তোফায়েল আহমেদের ওই অনড় অবস্থানের কারণে সমঝোতা ভণ্ডুল হয়ে যায় এবং আওয়ামী লীগ একতরফা কলঙ্কিত নির্বাচন করে তাদের ক্ষমতা প্রলম্বিত করে। কিন্তু হাসিনার এই প্রলম্বিত শাসনে তোফায়েল আহমেদ থেকে যান অবহেলিত ও উপক্ষিত।
তোফায়েল আহমেদকে আমি খুব কাছে থেকে দেখি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে। ঢাকায় পাব্লিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টে মালির চাকরি করতেন আমাদের গ্রামের তমেছ ভাই। উনি আমাদেরকে ছোটবেলায় কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন। পরে আমাদের এক চাচা তমেছ ভাইকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে চাকরি দেন। তমেছ ভাই ছিলেন শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের অন্ধ ভক্ত। তাদের দলীয় মিটিং-মিছিলে যেতেন। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তান আর্মির ক্র্যাকডাউনের পর তমেছ ভাই গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। তার কাছ থেকে ঢাকার গল্প শুনতাম আমরা। এক দিন সকালবেলা আমাদের বাড়ির সামনের বেলতলায় বসেছিলাম। ঝাঁকড়া চুলের এক যুবক সে সময় যাচ্ছিলেন ওই পথে। সঙ্গে আরও জনা-দুই লোক। তমেছ ভাই হঠাৎ লাফিয়ে উঠে ‘আরে তোফায়েল ভাই’ বলে যুবককে জড়িয়ে ধরলেন। যুবক বিব্রত। বললেন, ‘ভুল করছেন। আমি তোফায়েল ভাই নই।’ তমেছ ভাই কণ্ঠের জোর বাড়িয়ে বললেন, ‘ভাই, আপনাকে চিনতে আমার ভুল হবে?’ এবার তোফায়েল ভাই গলা নামিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে। কিন্তু সময় খারাপ। এখানে কে কোন পক্ষের লোক জানি না। কাজেই আমার পরিচয় কাউকে দেওয়ার দরকার নেই।’ তমেছ ভাই সায় দিলেন।
আমার এক চাচা, আব্বার ফুপাত ভাই, তাহেরুল ইসলাম খান তখন প্রাদেশিক পরিষদে সদ্য সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হয়েছেন। তাকে আমরা ডাকতাম মানিক চাচা। তিনি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সংসদ রাকসুর ভিপি এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। ছাত্রত্ব শেষ হতেই আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি এমপিএ হন। মানিক চাচাদের বাড়ি তখন লীগের কেন্দ্রীয় নেতায় সরগরম। রাজশাহী থেকে এসেছেন এএইচএম কামারুজ্জামান হেনা এবং ঢাকা থেকে তোফায়েল আহমেদসহ বেশ কজন। তারা চার-পাঁচ দিন ছিলেন। পরে সিরাজগঞ্জ থেকে লঞ্চ নিয়ে এলেন ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, তার দুই ছেলে সেলিম ও নাসিম এবং অধ্যাপক আবু সাইয়িদসহ বেশ কজন। সকাল ১০টার দিকে তারা এসে পৌঁছালেন। দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর আমাদের মানিক চাচা সব আওয়ামী নেতাদের নিয়ে গাড়িবহরে করে হিলি সীমান্ত পথে ভারতযাত্রা করলেন।
ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান কাল থেকেই আমি মিটিং-মিছিল, আন্দোলন-সংগ্রামে শামিল হয়ে গিয়েছিলাম। হাই স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছাত্র হিসেবে এতদিনে ছাত্র ইউনিয়নের মেম্বারও হয়ে গেছি। তবে আত্মীয় বলে কথা। আত্মীয়তার সুবাদে মানিক চাচাদের বাড়িতে যাতায়াত করতাম এবং মুক্তিযুদ্ধের সূচনাতেই লীগের কজন বড় নেতার সঙ্গে পরিচিত হই। ওই সময় আমাদের গ্রামের শাহজাহান আলী আখন্দ শহরে ছাত্রলীগ করতেন। পাশের চন্দনবাইশা গ্রামের সারোয়ার হোসেন করতেন ছাত্র ইউনিয়ন। সত্তরের নির্বাচনের সময় মানিক চাচার প্রভাবে সারোয়ার হোসেন ইউনিয়ন ছেড়ে ছাত্রলীগে যোগ দেন। একাত্তরে ওরা দুজন মানিক চাচার বাসায় লীগ নেতাদের সেবা-যত্ন করতেন। স্বাধীনতার পর তোফায়েল সাহেব বিনা পরীক্ষায় শাহজাহান আলী আখন্দকে ইনকাম ট্যাক্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার এবং সারোয়ার হোসেনকে পাটকল করপোরেশনে প্রকিউরমেন্ট অফিসারের চাকরি দেন। এদের মতো আরও অনেককেই তোফায়েল সাহেব চাকরি দিয়েছিলেন স্বাধীনতার পর। এরা সবাই ‘তোফায়েল ক্যাডার’ নামে পরিচিত হয়েছিল।
১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আমাদের এলাকার আওয়ামী সংসদ সদস্য ছিলেন সিরাজুল ইসলাম সুরুজ। ‘চুয়াত্তর সালের শেষের দিকে কোনো এক বিষয়ে তার সঙ্গে আমার উত্তেজনাকর বাকবিতণ্ডা হয়। এরপর গুপ্ত বামপন্থী সশস্ত্র রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্রব রয়েছে এমন অভিযোগে পুলিশ ও রক্ষীবাহিনী আমাকে খুঁজতে শুরু করে। আমি ঢাকায় থাকতাম শান্তিবাগে আমার ছোট কাকার বাসায়। সেখানে রোজ সাঁঝে আড্ডা জমাতেন কাকার বন্ধুবান্ধবরা। তার মধ্যে একজন ছিলেন বিখ্যাত লেখক-রাজনীতিক খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস। তিনি ‘মুজিববাদ’ নামে ঢাউস বই লিখেছিলেন এবং শেখ সাহেবের খুব পছন্দের একজন ছিলেন।
তখন ১৯৭৫ এবং বাকশাল হয়ে গেছে। ইলিয়াস চাচা আমাকে এক দিন নিয়ে গেলেন তোফায়েল আহমেদের কাছে। বললেন আমার সমস্যার কথা। তোফায়েল সাহেব বললেন, ওকে আমি চিনি। জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি তাহেরের ভাতিজা তো?’ আমি মাথা নাড়লাম। তিনি বললেন, ‘আমি শেখ শহীদকে বলে দেব। তুমি তার সঙ্গে গিয়ে দেখা করে জাতীয় ছাত্রলীগে যোগ দাও। আর কোনো সমস্যা থাকবে না।’
আমি আপত্তি করলাম। রেগে গেলেন তোফায়েল সাহেব? বললেন, ‘কেন যোগ দেবে না? ছাত্র ইউনিয়ন তো জাতীয় ছাত্রলীগে ঢুকে গেছে। তোমার সমস্যা কী? আমার মনে হচ্ছে তুমি সত্যিই নক্সাল মুভমেন্টে যোগ দিয়েছ। তোমার জন্য কিচ্ছু করতে পারব না আমি।’
তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে এরপর অনেকবারই দেখা হয়েছে। আমি সাংবাদিকতায় যোগ দেওয়ার পর তার সঙ্গে অনেক সময় ঘন ঘন দেখা হয়েছে নানা উপলক্ষে এবং ঘটনা চক্রে। সেসব স্মৃতির সবকিছুই লিখবার মতো নয়।
এরশাদ আমলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের বাইরে আওয়ামী লীগের কোনো একটা প্রোগ্রাম হচ্ছিল। সেখানে কী একটা কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুলিশ বেধড়ক লাঠিপেটা শুরু করে। একদল নেতাকর্মীসহ তোফায়েল আহমেদ ক্লাবের ভেতর আশ্রয় নেন। আমরা তাকে লাউঞ্জে বসাই। তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘এর কোনো মানে হয়? আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করছিলাম। পুলিশ কেন সেখানে হামলা করল?’
পাশে ছিলেন শামসুদ্দিন আহমেদ। আমরা তাকে পেয়ারা ভাই বলে ডাকি। তিনি এবিএম মূসার ভাগ্নে। ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। স্বাধীনতার পর জাসদ ছাত্রলীগ ও গণকণ্ঠে সাংবাদিকতা করেছেন। আওয়ামী নিবর্তনের শিকার হয়ে জার্মানি চলে গিয়েছিলেন। তারপর যুক্তরাষ্ট্রে। দেশে ফিরে ফেরেন সাংবাদিকতায়। কাজ করেছেন ইউনিসেফেও। পেয়ারা ভাই ধীরকণ্ঠে বললেন, ‘এমনই হয় তোফায়েল ভাই। আপনারা ক্ষমতায় থাকতে আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে এভাবেই হামলা করা হতো। আপনারা যদি তেমন বাজে নজির স্থাপন না করতেন তাহলে হয়তো আজকে এমন ঘটনা ঘটত না।’ তোফায়েল আহমেদ কিছু না বলে অপলক তাকিয়ে রইলেন পেয়ারা ভাইয়ের মুখের দিকে।
অনেক বড় রাজনীতিক হলেও তার নিজের দলের ভেতরেই তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী গ্রুপ ছিল। তিনি অনেক সময় অল্পেই উত্তেজিত হয়ে উঠতেন এবং তার উদ্ধত আচরণের ব্যাপারে অনেকেরই আপত্তি ছিল। মনমতো সংবাদ না লেখায় তোফায়েল আহমেদ মালিককে চাপ দিয়ে কয়েকজন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুতও করিয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতাসীন হলে সরকারের বিরুদ্ধে তিনি উগ্র এবং অনেক ক্ষেত্রে অবিবেচক ভূমিকা পালন করেন। সালটা ঠিক মনে নেই, তোফায়েল আহমেদ এক দিন পার্লামেন্টে পানিসম্পদমন্ত্রী জেনারেল মজিদ-উল-হকের বিরুদ্ধে মস্ত দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। জনাব হক পাল্টা চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ‘তোফায়েল সাহেব দুর্নীতির যে অঙ্কের কথা বলছেন তা মন্ত্রণালয়ের পুরো পাঁচ বছরের বাজেটের চেয়েও বেশি।’ জনাব তোফায়েল তখন আবেগ থরথর কণ্ঠে জ্বালাময়ী বক্তৃতা করে বলেন, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। ভয়ংকর অঙ্গীকার! প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অভিযোগ তদন্তে সংসদীয় কমিটি করে দিলেন। জনাব তোফায়েলকেও সদস্য করে দিলেন সে কমিটির। মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হলো, কমিটি যখন যে কাগজপত্র দেখতে চায় তা যেন অনতিবিলম্বে সরবরাহ করা হয়।
তোফায়েল সাহেব বললেন, এগুলো সবই আইওয়াশ। নির্দেশ দিলেও মন্ত্রণালয় বিরোধী দলের সদস্যকে সব কাগজ দেখাবে না। কাজেই বিএনপি সরকারকে ক্ষমতায় রেখে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না।
কিন্তু অপ্রমাণিত সেই অভিযোগ সহস্র কণ্ঠে অজস্রবার প্রচার করে তোফায়েল সাহেবরা জেনারেল মজিদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিলেন। এরপর ক্ষমতায় এসেও সে অভিযোগ প্রমাণের কোনো গরজ তোফায়েল আহমেদ অনুভব করেননি। ভাগ্যের পরিহাস দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে তোফায়েলপত্নী দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। তার পালিতপুত্র ও ভাতিজা বিপ্লবের বিরুদ্ধেও দুদকের এন্তার অভিযোগ। আর তোফায়েল সাহেব ক্ষমতার প্রতাপ খাটিয়ে তার বিরুদ্ধের একটি দুর্নীতির অভিযোগ ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিলেন। এখন সে মামলা চালু হয়েছে। জীবন্মৃত তোফায়েল আহমেদকে সে মামলায় হাজির করার হুকুমও দেওয়া হয়েছিল আদালত থেকে।
তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয় সম্ভবত ২০১৩ সালের রোজার সময়ে। আমার ইফতারের দাওয়াত ছিল পূর্বাণী হোটেলে। বেরিয়ে রাস্তার অবস্থা দেখে বুঝলাম ইফতারির আগে পৌঁছানো কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নিলাম গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিসে ফিরে গিয়েই ইফতার করি। ওই অফিস বাড়ির মালিক ইয়াহিয়া গুলশান ক্লাবের মেম্বার। ওখান থেকে রোজ কিছু ইফতারি আসে। আমি ভাবলাম আরও কিছু ইফতারি কিনে নিয়ে যাই। স্পিটফায়ার নামের একটা রেস্তোরাঁর সামনে শামিয়ানা খাটিয়ে ইফতারির পসরা সাজানো। লোকে সার বেঁধে কিনছে। গিয়ে দেখি ড্রাইভারকে লাইনে দাঁড় করিয়ে তোফায়েল আহমেদ গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন আছেন?’ গলা নামিয়ে বললেন, ‘তোমাদের চেয়েও খারাপ।’ আমি তীক্ষ্ণ চোখে চাইলাম তার দিকে। অল্পকথায় তিনি তার প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলার বিবরণ দিয়ে বললেন, ‘বঙ্গভবনের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও অনেক সময় আমাকে দাওয়াত দেওয়া হয় না।’
বললাম, ‘এত অপমান সয়েও তাহলে আওয়ামী লীগে পড়ে আছেন কেন?’ তিনি বুক দুলিয়ে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লেন। আস্তে আস্তে বললেন, ‘আমি কোথায় যাব বলো? আওয়ামী লীগ ও আমি যে সিনোনিমাস হয়ে আছি। যত যাই হোক, আমি যে বঙ্গবন্ধুর তোফায়েল, আওয়ামী লীগের তোফায়েল। মৃত্যুর আগে তো আর আমাদেরকে আলাদা করা যাবে না।’
এরপর তোফায়েল আহমেদ ২০১৪ সালে হাসিনা ক্যাবিনেটে মন্ত্রী হয়ে ২০১৯ পর্যন্ত ছিলেন। তখন দলের পক্ষে আবারও তাকে প্রবল ভূমিকায় দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের ভেতরকার রসায়ন তাকে করোনাকালের পর ফের অগুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ঠেলে নামিয়ে দেয়। সেই অবনমন হয়তো আর ঘুচবে না রাজনীতির তোফায়েল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তির আগে।
(মূল লেখাটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে )



