ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের নেপথ্যে -
তৃনমূলের এই ভরাডুবির পিছনে কি ভোট কারচুপি নাকি গন মানুষের প্রত্যাখ্যান?
ডেস্ক রিপোর্টঃ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র উত্থান সাম্প্রতিক নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রথমত, ২০২৪ সালের ভারতের লোকসভা নির্বাচন ২০২৪-এ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি প্রত্যাশিত ফল করতে ব্যর্থ হয়। ওই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ৪২টির মধ্যে ২৯টি আসন জয় করে, যেখানে বিজেপি পায় মাত্র ১২টি আসন । এই ফলাফল থেকে স্পষ্ট হয় যে রাজ্যে বিজেপির সংগঠন থাকলেও ভোটব্যাঙ্ক তখনও পুরোপুরি তাদের পক্ষে আসেনি।
তবে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এ নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যায়। এই নির্বাচনে বিজেপি ২০০-র বেশি আসন জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করে এবং প্রথমবারের মতো রাজ্যে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে যায় । দীর্ঘদিনের শাসক দল টিএমসি এই নির্বাচনে বড় ধরনের ধাক্কা খায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির এই উত্থানের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। রয়েছে ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রভাব। বিজেপি তার প্রচারণায় হিন্দুত্ববাদী আদর্শকে গুরুত্ব দিয়ে রাজ্যের একটি অংশের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি-এর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং শক্তিশালী প্রচার কৌশল দলটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এক্ষেত্রে আরো যে বিষয়গুলো সামনে আসছে -
ভোটের ধরণে পরিবর্তন:
২০২৬ সালের নির্বাচনে মহিলাদের ব্যাপক ভোটদান সত্ত্বেও টিএমসি সেই সমর্থন ধরে রাখতে পারেনি। বরং বিজেপি কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করে ।
স্থানীয় আসনে বিজেপির অগ্রগতি:
যেমন, গড়বেতা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয়লাভ করেন, যা গ্রামীণ এলাকায় দলের বিস্তারের উদাহরণ । যদিও কিছু আসনে টিএমসি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, যেমন বজবজে তারা বড় ব্যবধানে জয় পায় —যা দেখায় প্রতিযোগিতা পুরোপুরি একপাক্ষিক নয়।
অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি (শাসকবিরোধী মনোভাব):
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা টিএমসি সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রশাসনিক সমস্যা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। বিজেপি এই অসন্তোষকে কার্যকরভাবে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে।
কৌশলগত প্রচারণা ও নেতৃত্ব:
নরেন্দ্র মোদি-এর নেতৃত্বে বিজেপি জাতীয়তাবাদ, উন্নয়ন এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা তুলে ধরে ভোটারদের কাছে পৌঁছায়। পাশাপাশি শক্তিশালী সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সহায়তা মাঠপর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করেছে।
ভোটার তালিকা ও নির্বাচনী বিতর্ক:
২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং পুনঃভোটসহ নানা বিতর্কও সামনে আসে, যা নির্বাচনের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলে । বিপুল সংখ্যক মুসলিমদেরকে কৌশলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয় যারা ঐতিহাসিকভাবে তৃনমূলকে ভোট দিত। অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে ‘বাংলাদেশী’ তকমা দেয়া হয়।
মোটকথা হলো, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান হঠাৎ নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। ২০২৪ সালে তুলনামূলক দুর্বল ফলাফল থেকে ২০২৬ সালে ঐতিহাসিক জয়ে পৌঁছানো দেখায় যে দলটি কৌশলগতভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করেছে।
এই পরিবর্তন শুধু রাজ্যের রাজনীতিতেই নয়, বরং ভারতের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভারসাম্যেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে এই নতুন সমীকরণ কতটা স্থায়ী হয়, তা নির্ভর করবে বিজেপি কতটা দক্ষতার সাথে রাজ্যের স্থানীয় চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে তার ওপর।



