"পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জন্য গরুর মাংস অধিকার, স্বাধীনতা, এবং সম্মানের প্রতীক।"
.........১১৭৮ সালে এখানে ইসলাম প্রচার করতে আরব থেকে আসেন দরবেশ হযরত আদম (র.)। তিনি একটি গরু কোরবানি করেন। এতে রাজা বল্লাল সেন ক্রুদ্ধ হয়ে আদম (র.)কে অত্যন্ত নৃশংস ভাবে হত্যা করেন.........
মীর সালমান শামিল একজন তরুণ বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ জর্জিয়াতে পিএইচডি গবেষক হিসেবে কর্মরত আছেন। সম্প্রতি বাংলার গরু কুরবানির ইতিহাস ও বাস্তবতা নিয়ে তার বেশ কয়েকটি লেখা সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোড়ন তুলেছে। আমাদের পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হল।
০১।
বাংলাদেশের অভিনবত্ব সম্ভবত একটা জায়গাতেই, গরুর মাংস। গরুর মাংসের জন্য সংগ্রাম, আন্দোলন এবং রক্ত দিতে হয়েছে, এমন ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই। বনী ইসরাইলের সামেরির পরে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গরু হল পূর্ব বাংলার গরু। পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জন্য গরুর মাংস অধিকার, স্বাধীনতা, এবং সম্মানের প্রতীক। এই প্রতীকের জন্ম কোনো একদিনে হয়নি; এর পেছনে রয়েছে শত বছরের সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা, প্রতিরোধ, রক্তপাত এবং অবশেষে মুক্তির ইতিহাস।
সিলেটের রাজা গৌড় গৌবিন্দ সম্পর্কে কম বেশি সবারই জানা। শেখ বোরহানউদ্দিন নামে একজন ব্যক্তি উনার শিশুপুত্রের আকিকার জন্য গরু কুরবানী করেছিলেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে গৌড় গোবিন্দ শেখ বোরহানউদ্দিনের হাত কেটে দেয় এবং শিশু পুত্রকে হত্যা করেন। বোরহানউদ্দিন সুলতান শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহের কাছে গিয়ে বিচার প্রার্থনা করেন। ফিরোজ শাহ উনার ভাতিজা সিকান্দার গাজীর নেতৃত্বে একটা সেনাবাহিনী পাঠান। গৌড় গোবিন্দের শক্তিশালী বাহিনীর কাছে সিকান্দার গাজী দুইবার পরাজিত হন। তৃতীয়বার প্রধান সেনাপতি নাসিরুদ্দিনের নেতৃত্বে আবারও অভিযান প্রেরণ করা হয়। এই জিহাদে ৩৬০ জন দরবেশকে নিয়ে হযরত শাহজালাল (র.) নাসিরুদ্দিনের বাহিনীর সাথে যোগ দেন। এবার গৌড় গোবিন্দ পরাজিত হয় এবং সিলেট মুসলিম সালতানাতের সাথে যুক্ত হয়। সময়টা ছিল ১৩০৩ সাল। এখানে গরুর কোরবানি কেবল একটি ধর্মীয় রীতি নয়; এটি ছিল নতুন সামাজিক বাস্তবতার সূচনা।
একই ধরনের ঘটনা ঘটে মুন্সিগঞ্জে। তবে আরো আগে। ১১৭৮ সালে এখানে ইসলাম প্রচার করতে আরব থেকে আসেন দরবেশ হযরত আদম (র.)। তিনি একটি গরু কোরবানি করেন। এতে রাজা বল্লাল সেন ক্রুদ্ধ হয়ে স্বসৈন্যে হযরত আদম (র.) এর বিরুদ্ধে অভিযানে নামেন। বল্লাল সেন আদম (র.)কে অত্যন্ত নৃশংস ভাবে হত্যা করেন। এর প্রতিক্রিয়াতে মুন্সিগঞ্জও মুসলিম সালতানাত প্রতিষ্ঠা হয়। এগুলো পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মানসিক ইতিহাসে একটি স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যায়। ব্রিটিশ ফিরিঙ্গিদের আমলে সূর্যাস্ত আইন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তসহ বিভিন্ন আইনের কারনে প্রায় সব মুসলিম জমিদার পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের স্থানে বসানো হয় হিন্দুদের। হিন্দু জমিদাররা পুনরায় তাদের পূর্বোক্ত গৌড় গৌবিন্দ, বল্লাল সেনদের মত গরু কোরবানির উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
মুসলমানরা এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, সংগ্রাম করে, ব্রিটিশ সরকারকে একাধিকবার স্মারকলিপি দেয়। তবে হিন্দু জমিদাররা চরমতম নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে তা দমন করে।
ঢাকায় নবাব পরিবারের প্রভাব ছিল, একমাত্র এই ঢাকা ছাড়া সারাদেশে কোথাও মুসলমানরা গরু কোরবানি দিতে পারতো না। সবাই ছাগল(বকরি) কোরবানি দিতো। তাই কালক্রমে ঈদুল আজহা ‘বকরির ঈদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
এভাবেই চলে শত বছর। এরপর খাজা সলিমুল্লাহ প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম লীগ। তারপর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আল্লামা মোহাম্মদ ইকবাল এবং কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং ১৯৪৭। পূর্ব বাংলা মুক্ত হয় ব্রিটিশ বেনিয়া এবং হিন্দু জমিদারদের কালো হাত থেকে।
সুবাতাস বইতে শুরু করে। তবে তা একদিনে হয়নি। প্রাক্তন আমলা পি.এ নজির “স্মৃতির পাতা থেকে” বইয়ে চাকুরী জীবনের কিছু ঘটনা উল্লেখ করেন। দেশভাগের পরেও ক্ষমতাবান সদ্য বিগত হওয়া হিন্দু জমিদারদের প্রভাবে গরু কুরবানি দেওয়া অঘোষিত ভাবে নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৫৬ সালেও নাটোরের মানুষ গরু কোরবানি দেবার কথা ভাবতেও পারতো না। উনার উদ্যোগে ১৯৫৭ সালে নাটোর শহরে প্রথমবারের মত গরু কোরবানি দেওয়া হয় তাও বহু কাঠখড় পুড়িয়ে। একের পর এক বাঁধা আসে। একই অবস্থা ছিলো ময়মনসিংহ, খুলনা, যশোরে।
৪৭ এর স্বাধীনতা, পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জন্য কেবল রাষ্ট্রিক স্বাধীনতা নয়, বরং সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার পুনরুদ্ধারের মুহূর্ত ছিল। জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম পরিচয়-রাজনীতি রাষ্ট্রিক রূপ পায়। জমিদারি বিলোপের পর হিন্দু জমিদারদের সামাজিক ক্ষমতা ভেঙে যায়, এবং কোরবানি আবার স্বাভাবিক হয়।
এখন এই পূর্ব বাংলায় গরু কোরবানি দিতে পারে কিন্তু উপমহাদেশের গল্প ভিন্ন। নড়বড়ে সীমান্তের ওপারে আরএসএস, বিজেপির ভারতে এখনো গরু কোরবানি করা নিষিদ্ধ। এখনো ভারতের মুসলমানরা ঈদুল আজহাতে ছাগল কোরবানি করে। এখনো ভারতে ঈদুল আজহাকে বকরির ঈদ বলে অভিহিত করা হয়।
গরুর মাংস নেহাত একটা খাবার না। গরুর মাংস শত বছরের সামাজিক মর্যাদা, প্রতিরোধ, পরিচয়, এবং বিজয়ের এক অনন্য প্রতীক।
সম্ভবত এজন্যই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন,
❝ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্বোধন।
ওরে সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্বোধন।❞
০২।
আল্লাহ তায়ালা অকৃতজ্ঞদের পছন্দ করেন না। আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের শোকর না করলে আল্লাহ সেই নেয়মত উঠিয়ে নিতে পারেন।
স্কুলে থাকতে আমাদের পাঠ্যবইতে ড. শহীদুল্লাহর একটা গল্প ছিল, নাম: সততার পুরস্কার। গল্পের কাহিনী হল, আল্লাহ ৩ জন দীনহীন পথের ফকিরকে সম্পদশালী বানিয়ে দেন। কিন্তু আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় না করায় এই ৩ জনের মধ্যে ২ জনকে আবার পথের ফকির বানিয়ে দেওয়া হয় আর শুকরিয়া আদায়কারীর সম্পদ আরো বেড়ে যায় বহুগুনে।
এখন বইতে গল্পগুলো আছে কিনা কে জানে। এখন পাঠ্যবইতে সদা-সর্বদা বিরাজ করে রঠা আর বঙ্কিমেরা।
আমরা বাংলাদেশের মুসলমানেরা আজ কোরবানি দিতে পারছি, ভারতের মুসলমানরা পারছে না। ভারতের মুসলমানেরা নামাজ পড়তে যেতে পর্যন্ত ভয় পাচ্ছে। মুসলমানদের কোরবানির পশু ভারতের জল্লাদ বাহিনী লুট করে নিয়ে যাচ্ছে।
আল্লাহ যে আমাদের নিরাপদে নামাজ পড়ার এবং কুরবানী করার যে সুযোগ দিয়েছেন, আমরা কোন ভাবেই এর যোগ্য না। এটা একান্তই খাস করে আল্লাহর রহমত। এজন্য আল্লাহ দরবারে বেশি বেশি শুকরিয়া আদায় করুন। ভারতের মজলুম মুসলমানদের জন্য দোয়া করুন। এবং আল্লাহতালা যাদের মাধ্যমে আমাদেরকে এই জল্লাদদের হাত থেকে বাঁচিয়েছে তাদের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করুন।
আল্লাহ, আমাদের নেতা খাজা সলিমুল্লাহ, কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, আল্লামা ইকবাল, চৌধুরী রহমত আলী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ সকল নেতার কবরকে জান্নাতের বাগিচা বানিয়ে দিন।
( মীর সালমান শামিলের ফেসবুকে ফলো করতে ক্লিক করুন এখানে)




