জাতীয় মানবাধিকার আইনের সংস্কারে বড় ধাক্কা: আইনি শূন্যতার আশঙ্কায় বিদায়ী কমিশনারদের খোলা চিঠি
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের আকুতি— “আমাদের এখন কী হবে?”—সেই নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই তারা মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) পাঁচজন বিদায়ী কমিশনার এক খোলা চিঠির মাধ্যমে দেশে মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ‘আইনি শূন্যতা’ সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করার প্রেক্ষিতে তারা এই উদ্বেগ জানান। কমিশনারদের মতে, এর ফলে গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবার আইনি প্রতিকারহীন অবস্থায় পড়ে গেছে।
সংসদে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো পাস না হওয়ায় কমিশনারদের পদের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। আজ প্রকাশিত ওই চিঠিতে তারা জানান, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের আকুতি— “আমাদের এখন কী হবে?”—সেই নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই তারা মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন।
সংসদে ভুল তথ্যের প্রতিবাদ
চিঠিতে বিদায়ী কমিশনাররা সংসদীয় বিতর্কে উত্থাপিত বেশ কিছু তথ্যের কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন:
গুমের শাস্তি: সংসদে দাবি করা হয়েছিল যে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র ১০ বছর। এর বিপরীতে কমিশনাররা জানান, বাতিলের তালিকায় থাকা অধ্যাদেশে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল।
তদন্তের সময়সীমা ও জরিমানা: ২০০৯ সালের পুরনো আইনে তদন্তের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা জরিমানা আদায়ের কোনো কার্যকলা ছিল না, যা বাতিল হওয়া নতুন অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বনাম গুম: কমিশনাররা যুক্তি দেন যে, আইসিটি আইন কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধ বা সুশৃঙ্খল গণ-অপরাধের বিচার করতে পারে। বিচ্ছিন্ন কোনো গুমের বিচার সেখানে সম্ভব নয়। ১১ এপ্রিলের পর থেকে সংঘটিত নতুন কোনো গুমের ক্ষেত্রে এখন আর কোনো কার্যকর আইনি প্রতিকার নেই।
জুলাই অভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের সুরক্ষা: বাতিল হওয়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডগুলো তদন্ত করতে পারত। কিন্তু ২০০৯ সালের পুরনো আইন পুনর্বহাল হওয়ায় কমিশন এখন আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করতে পারবে না—অথচ জুলাইয়ের ঘটনায় ওই বাহিনীগুলোই ছিল মূল প্রতিপক্ষ।
কমিশনের স্বাধীনতায় সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ
সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনের বরাতে কমিশনাররা বলেন, সরকার চারটি মূল আপত্তির মাধ্যমে কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব করতে চেয়েছে:
১. কমিশনকে রাষ্ট্রপতি বা প্রধান বিচারপতির জবাবদিহিতার বাইরে এনে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া।
২. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে সরকারের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা, যা তদন্তের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করে।
৩. জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত আটকের বিষয়টিকে ‘গুমের’ সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া, যা সংবিধানের ৩৩(২) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।
৪. কমিশন গঠনে সার্চ কমিটিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রাখা।
শক্তিশালী আইনের আহ্বান
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এই অধ্যাদেশগুলো তৈরির আগে বর্তমান আইনমন্ত্রীসহ প্রায় ৬০০ অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছিল। অধ্যাদেশগুলো সরাসরি বাতিল না করে আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করা যেত।
বাংলাদেশ যেহেতু গুম বিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশনে (ICCPED) স্বাক্ষর করেছে, তাই অনুচ্ছেদ ৪(১) অনুযায়ী গুমকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইন করা রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। কমিশনাররা সুশীল সমাজ ও ভুক্তভোগীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান যে, ভবিষ্যতে সরকার কি আরও দুর্বল কোনো আইন আনবে নাকি বাতিল হওয়া অধ্যাদেশের চেয়েও শক্তিশালী কোনো আইন প্রণয়ন করবে।
চিঠির শেষে কমিশনাররা এক আবেগঘন বার্তায় বলেন, “যে পরিবারগুলো এখনো দরজায় কান পেতে প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষা করছে, তারা অনেক ফাঁপা প্রতিশ্রুতি শুনেছে। ‘আমাদের এখন কী হবে?’—এই প্রশ্নের উত্তর কেবল কথায় নয়, শক্তিশালী ও কার্যকর আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই দিতে হবে।”
আমাদের পাঠকদের জন্য চিঠিটি হুবুহু প্রকাশিত হলো।







