বিশ্ব শক্তির নতুন সমীকরণ: ইউরেশিয়ার ৮ টি দেশের উত্থান
এই দেশগুলো কখনো যুক্তরাষ্ট্র, কখনো চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে চলে, ফলে তারা কার্যত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে “নির্ধারক” ভূমিকা নিতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়া, চীনের উত্থান এবং বহুমুখী শক্তি কাঠামোর (multilateralism) প্রসার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ইউরেশিয়ার কয়েকটি “মাঝারি শক্তিধর” দেশ—যাদের “সুইং স্টেট” বলা হচ্ছে—বিশ্ব শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম Deutsche Welle-এর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এমন একটা উপসংহার টেনেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, হাঙ্গেরি, কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া, উজবেকিস্তান এবং তুরস্ক—এই আটটি দেশ এমন এক কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তারা একাধিক পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করছে। বিশেষজ্ঞ Ken Moriyasu উল্লেখ করেন, এই দেশগুলো কখনো যুক্তরাষ্ট্র, কখনো চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে চলে, ফলে তারা কার্যত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে “নির্ধারক” ভূমিকা নিতে পারে।
পাকিস্তানের উদাহরণ তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটি ইরান-সংকট ঘিরে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে, যা একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেখায় কীভাবে একটি দেশ দুই পরাশক্তির মধ্যেই ভারসাম্য রেখে নিজের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।
প্রতিবেদনটি আরও দেখায়, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুধু সমুদ্রভিত্তিক অঞ্চল—যেমন ইন্দো-প্যাসিফিক—নয়, বরং স্থলভাগেও (Eurasian landmass) তীব্র হয়ে উঠছে। বিশেষ করে চীন দীর্ঘদিন ধরে ভারত মহাসাগরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থলপথে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যাতে সমুদ্রপথের “চোকপয়েন্ট” এড়িয়ে যাওয়া যায়। এই প্রেক্ষাপটে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মতো দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যারা ইউরেশিয়ার স্থল করিডর নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
ইউরোপের মধ্যে হাঙ্গেরি একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। দেশটি একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, মধ্য এশিয়ার কাজাখস্তান তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চীন ও ইউরোপের মধ্যে রেল ও জ্বালানি সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, তবে দেশটি রাশিয়া বা চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে চায় না—বরং “মাল্টি-ভেক্টর” কূটনীতি অনুসরণ করছে।
উজবেকিস্তান তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থানে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার সুযোগ পাচ্ছে, আর মঙ্গোলিয়া রাশিয়া ও চীনের মাঝখানে অবস্থান করেও উভয় পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ইতিহাসের প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ—মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অতীত এখনও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানসিকতায় প্রভাব ফেলে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুইং স্টেট হিসেবে তুরস্ককে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত দেশটি একাধিক ভূরাজনৈতিক পরিচয় বহন করে—ইসলামিক বিশ্ব, ব্ল্যাক সি অঞ্চল এবং সাবেক অটোমান প্রভাববলয়—যা তাকে বহুমাত্রিক কৌশলগত সুবিধা দেয়। একই সঙ্গে তুর্কি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের মাধ্যমে তুরস্ক ভবিষ্যতে চীনের পশ্চিম সীমান্তে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়, এই সুইং স্টেটগুলোকে নিজেদের পক্ষে টানতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, অবকাঠামো, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে চীন বর্তমানে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। চীনের লক্ষ্য হলো এমন একটি “shared future” বা যৌথ উন্নয়নের কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে চীনের সঙ্গে এতটাই সংযুক্ত থাকবে যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তারা বেইজিংয়ের পক্ষ নেবে।
সব মিলিয়ে, ডয়চে ভেলের এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে ভবিষ্যতের বিশ্ব রাজনীতিতে শুধু পরাশক্তি নয়, বরং এই কৌশলগত “সুইং স্টেট” দেশগুলোর সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বৈশ্বিক শক্তির নতুন ভারসাম্য ।
আমাদের এই প্রতিবেদনটি DW- এর সদ্য প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদন অনুসারে অনুলিখিত। আপনি মূল ভিডিও প্রতিবেদনটি দেখতে পারেন এখানে -



