আইন অনুযায়ী ধর্ষণ মামলার বিচার ১৮০ দিনে। বাস্তবে ১০ বছরেরও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে!
সেনানিতনুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ডিএনএ পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত মিললেও, একের পর এক তদন্ত সংস্থা বদল হয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো চার্জশিট হয়নি। প্রায় এক দশক পরও রাষ্ট্র বলতে পারছে না—তনুকে কারা হত্যা করেছিল!
ডেস্ক রিপোর্টঃ বাংলাদেশে ধর্ষণ যেন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি ক্রমশ রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, বিচারহীনতা এবং সামাজিক ভাঙনের এক ভয়াবহ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাটি দেশজুড়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজপথ—সবখানেই এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: কেন বারবার একই ধরনের নৃশংসতা ঘটছে, অথচ অপরাধীরা বছরের পর বছর বিচার এড়িয়ে যাচ্ছে?
রামিসার ঘটনা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে আরেকটি নির্মম নাম হয়ে যুক্ত হয়েছে—তনু, আছিয়া, সুবর্ণচরের গৃহবধূ কিংবা জাহাঙ্গীরনগরের ধর্ষণের শিকার সেই নারীর পাশে। প্রতিটি ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সরকার দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছে, তদন্ত কমিটি হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ মামলাই আটকে গেছে তদন্তের দুর্বলতা, আদালতের জট, কিংবা উচ্চ আদালতের দীর্ঘসূত্রতায়।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বর্তমান চিত্র ভয়াবহ। বিভিন্ন বিচারিক ও গবেষণা সূত্র অনুযায়ী, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বর্তমানে প্রায় দেড় লক্ষাধিক মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে কয়েক দশ হাজার মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। দণ্ডের হার মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ অধিকাংশ মামলায় অভিযুক্তরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে অথবা বিচার শেষই হচ্ছে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—রাষ্ট্র ধর্ষণকে “গুরুতর অপরাধ” হিসেবে ভাষণে তুলে ধরলেও বাস্তবে বিচার কাঠামো সেই গুরুত্ব বহন করতে পারছে না। আইন অনুযায়ী ধর্ষণ মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে তিন থেকে পাঁচ বছর, অনেক ক্ষেত্রে এক দশকেরও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।
এই ব্যর্থতার সবচেয়ে প্রতীকী উদাহরণ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলা।
২০১৬ সালে সেনানিবাস এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের পর দেশজুড়ে নজিরবিহীন আন্দোলন হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত মিললেও, একের পর এক তদন্ত সংস্থা বদল হয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া যায়নি। প্রায় এক দশক পরও রাষ্ট্র বলতে পারছে না—তনুকে কারা হত্যা করেছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অপরাধীদের মধ্যে ভয়হীনতা তৈরি করেছে। যখন অপরাধীরা দেখে যে আলোচিত মামলাগুলোও বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তখন আইনকে তারা আর কার্যকর বাধা হিসেবে দেখে না। ফলে ধর্ষণ শুধু বাড়ছেই না, এর নৃশংসতাও বাড়ছে—ধর্ষণের পর হত্যা, লাশ গুম, শিরশ্ছেদ—সবই এখন নিয়মিত সংবাদ শিরোনাম।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বাংলাদেশের বিচারিক ব্যর্থতার মূল চারটি জায়গা হলো—দুর্বল তদন্ত, ফরেনসিক অবকাঠামোর অভাব, সাক্ষী সুরক্ষার অনুপস্থিতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব।
অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে যথাযথ আলামত সংগ্রহ করতে পারে না। ডিএনএ রিপোর্ট পেতে মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর লেগে যায়। অনেক থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার জন্য প্রশিক্ষিত তদন্ত কর্মকর্তা পর্যন্ত নেই। ফলে আদালতে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা যায় না।
আরেকটি বড় সংকট সাক্ষী সুরক্ষা। বাংলাদেশে এখনো কার্যকর কোনো “সাক্ষী সুরক্ষা আইন” নেই। ফলে প্রভাবশালী আসামিপক্ষের হুমকি, সামাজিক চাপ কিংবা আর্থিক দুরবস্থার কারণে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার আদালতে সাক্ষ্য দিতে চায় না। অনেক ক্ষেত্রে তারা আপস করতে বাধ্য হয়। এতে অভিযুক্তরা “সন্দেহের সুবিধা” পেয়ে খালাস পেয়ে যায়।
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের বহুল আলোচিত গণধর্ষণ মামলায় নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলেও এখনো উচ্চ আদালতে আপিল ঝুলে আছে। মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায়ও একই অবস্থা। নিম্ন আদালতের রায় হয়েছে, কিন্তু কার্যকর হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় দেড় দশকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা মাত্র পাঁচ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করেছে। কিন্তু অপরাধ কমেনি। কারণ অপরাধীরা জানে—শাস্তি যত কঠোরই হোক, বিচার শেষ হতে যদি ১০ বছর লাগে, তাহলে আইনের ভয় কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই কথা বলছে। ভারত ধর্ষণ ও শিশু যৌন নির্যাতনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য শত শত ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠন করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশেষ “সেক্সুয়াল অফেন্সেস কোর্ট” চালু করেছে, যেখানে ভুক্তভোগীবান্ধব সাক্ষ্যগ্রহণ ব্যবস্থা রয়েছে। পাকিস্তানও অ্যান্টি-রেপ ক্রাইসিস সেল চালু করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো মামলার প্রতিটি ধাপ—তদন্ত, চার্জশিট, সাক্ষ্যগ্রহণ, আপিল—সবকিছুতেই দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতা রয়ে গেছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই সংকট শুধু বিচারব্যবস্থার নয়; এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিরও ব্যর্থতা। ধর্ষণের ঘটনায় প্রায়ই দেখা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী শুরুতে মামলা ঠেকাতে চেষ্টা করে। কোথাও সালিশ, কোথাও ভয়ভীতি, কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়—সব মিলিয়ে অপরাধীদের জন্য এক ধরনের অদৃশ্য সুরক্ষা বলয় তৈরি হয়।
রামিসার ঘটনায় সরকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, আশ্বাস আর বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে। তনু, আছিয়া কিংবা সুবর্ণচরের মামলাগুলোও একসময় “দৃষ্টান্তমূলক বিচারের” প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি সত্যিই ধর্ষণের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে প্রস্তুত, নাকি প্রতিটি আলোচিত ঘটনার পর কেবল ক্ষোভ প্রশমনের ভাষণই চলতে থাকবে?
কারণ বিচারহীনতার এই চক্র ভাঙতে না পারলে, রামিসা হয়তো শেষ নাম হবে না। আগামী দিনে আরও নতুন কোনো শিশু, আরও নতুন কোনো তরুণী, আরও নতুন কোনো পরিবার একই প্রশ্ন নিয়ে আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে—“বিচার কি আদৌ হবে?”

vidIQ




