ভারতে মুসলিমদের ঈদ উদযাপন ও কোরবানীতে বাধা : উৎসবের আনন্দের পরিবর্তে ভয়!
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এক্স (সাবেক টুইটার)-এ পোস্ট করেন — "যদি শান্তিপূর্ণভাবে মেনে নেয়, ভালো; না হলে অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে।" এই "অন্য পদ্ধতি"র হুমকি মুসলিমদের কাছে নতুন নয়!
এবারের ঈদুল আযহায় ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় উৎসবের আনন্দের চেয়ে ভয় ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন যা আল জাজিরা সহ বহু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্টে উঠে এসেছে। এই সব ডকুমেন্টেড ঘটনাগুলোর ওপর ভিত্তি করে রিপাবলিক টিভি ইউএসএ-র এই বিশেষ প্রতিবেদন।
উত্তরপ্রদেশে অনিশ্চয়তা
আলজাজিরার রিপোর্ট অনুসারে উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলার মালিয়ানা গ্রামের একটি ছোট মসজিদে প্রায় ৫০ জন মুসল্লি জড়ো হয়েছিলেন — কিন্তু কোরবানি বা সদকার কথা নয়, আলোচনা হচ্ছিল রাস্তা, ব্যারিকেড, পুলিশের অনুমতি এবং কোথায় ও কীভাবে ঈদের নামাজ আদায় করা যাবে তা নিয়ে।
“ভিড় করবেন না, ভিডিও এড়িয়ে চলুন”
মসজিদ কমিটির এক সদস্য মুসল্লিদের নির্দেশ দেন — “দয়া করে মসজিদের গেটের বাইরে জড়ো হবেন না। মসজিদ পূর্ণ হয়ে গেলে পরের নামাজের শিফটের জন্য অপেক্ষা করুন। ঝগড়া এড়িয়ে চলুন। ভিডিও এড়িয়ে চলুন। উস্কানিতে সাড়া দেবেন না।”
যোগী সরকারের হুঁশিয়ারি
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ গত ১৮ মে এক্স (সাবেক টুইটার)-এ পোস্ট করেন — “যদি শান্তিপূর্ণভাবে মেনে নেয়, ভালো; না হলে অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে।” মুসলিমরা জানান, এই “অন্য পদ্ধতি”র হুমকি তাদের কাছে অপরিচিত নয়।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতায় আসার পর থেকে উৎসাহিত হওয়া ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলি মুসলিমদের শুক্রবার ও উৎসবে রাস্তায় নামাজ পড়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছে।
ভীত মুসল্লিরা, ছোট হয়ে আসছে উৎসব
আলিগড় জেলার দোকানদার আরিফ মালিক জানান, গত বছর ঈদুল আযহায় তার এলাকার মুসলিমরা একটি খোলা মাঠে মাত্র কয়েক মিনিট নামাজ পড়েছিলেন, কিন্তু পুলিশ পরে মুসল্লিদের তাড়া করে। “এবারের ঈদে পরিবারগুলি মানুষজনকে ভিড় এড়িয়ে চলতে বলছে।”
মিরাটের ৩৩ বছর বয়সী দোকানদার আরশাদ বলেন, “আগে ঈদের সকালগুলো আনন্দময় লাগত। এখন আগের রাত থেকেই টেনশন শুরু হয়। মানুষ বারবার দেখছেন — পুলিশ আসবে কিনা, কেউ ভিডিও করে অনলাইনে দেবে কিনা।”
মানসিক চাপ ছড়িয়ে পড়ছে
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নুমান খান বলেন, “শারীরিকভাবে কিছু না হলেও মানুষ ক্যামেরায় ধরা পড়ার, অনলাইনে টার্গেট হওয়ার বা কিছুতে অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে আছেন। অভিভাবকরা তরুণদের মসজিদের বাইরে দাঁড়াতে মানা করছেন।”
পশ্চিমবঙ্গে ভীতি ও অস্থিরতা
পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। আল জাজিরার আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঈদুল আজহার আগে গবাদিপশুর বাজারগুলোতে ভীতি ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, কোরবানির পশু পরিবহন ও বিক্রিতে বাড়তি নজরদারি এবং প্রশাসনিক তৎপরতার কারণে বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের উপস্থিতি কমে যায়।
কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ কমিটিগুলোকে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করতে হয় এবং সরকার নির্ধারিত নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। অনেক মসজিদে রাস্তার পরিবর্তে একাধিক ধাপে নামাজের আয়োজন করা হয় যাতে জনসমাগম সড়কে ছড়িয়ে না পড়ে।
মুম্বাইতে সংঘর্ষঃ
মুম্বাইয়ের গোরেগাঁও এলাকায় একটি আবাসিক কমপ্লেক্সে কোরবানির আয়োজনকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে শেষ পর্যন্ত কোরবানির অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। পুলিশ জানায়, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মুসলিম সংগঠনগুলোর একাংশ এটিকে ধর্মীয় অনুশীলনের ওপর চাপ হিসেবে দেখছে।
বৈষম্যমূলক প্রয়োগের অভিযোগ
নতুন দিল্লির একজন আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করে। কিন্তু যদি একটি সম্প্রদায় বারবার কঠোর নজরদারির শিকার হয়, অন্যরা সুবিধা পায়, তাহলে আইনের সামনে সমতার প্রশ্ন উঠবেই।”
সমাজবিজ্ঞানী আজহার আহমদ খান বলেন, “নামাজ বিতর্কটি আসলে এই প্রশ্নেরই — আধুনিক ভারতে কে দৃশ্যমানতা, বৈধতা ও পরিচয়ের অধিকারী বলে বিবেচিত হবে।”
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অতীতে তথাকথিত “গোরক্ষক” বা গরু রক্ষার নামে মুসলিমদের ওপর হামলা, গণপিটুনি এবং সহিংসতার বহু ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব ঘটনা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে কোরবানি উপলক্ষে নিরাপত্তা ও হয়রানির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।ফলে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং আইন প্রয়োগের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



