নিউইয়র্ক , ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ। জালিয়াতি, নথি জাল করা, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে WHO ও বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের তদন্তের মধ্যেই বুধবার তিনি পদত্যাগ করেন।
সায়মা ওয়াজেদ ২০২৪ সালের শুরুতে পাঁচ বছরের মেয়াদে WHO-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন এই পদে দায়িত্ব পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি এবং দ্বিতীয় নারী। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার নিয়োগ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়।
কী অভিযোগ রয়েছে?
বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৫ সালে সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও নথি জাল করার অভিযোগে মামলা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে WHO তাকে প্রশাসনিকভাবে ছুটিতে পাঠায়। পরবর্তী সময়ে WHO নিজস্ব তদন্তও শুরু করে।
তদন্তে সায়মার বিরুদ্ধে চীন সফরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। WHO-এর অভিযোগ অনুযায়ী, ভ্রমণ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক জালিয়াতি হয়েছে। তবে সায়মার আইনজীবীরা দাবি করেছেন, বিষয়টি মাত্র ৯০১ মার্কিন ডলারের একটি প্রশাসনিক ভুল, যা তার এক সহকারী বা জুনিয়র কর্মীর মাধ্যমে reimbursement প্রক্রিয়ায় ভুলভাবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছিল। সায়মা নিজেও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও WHO প্রশ্ন তোলে। সায়মার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনি বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে একটি সম্মানসূচক ডিগ্রি পেয়েছেন এবং WHO মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশে একটি জমি অধিগ্রহণ নিয়েও WHO প্রশ্ন তোলে। সায়মার দাবি, তিনি WHO-তে যোগ দেওয়ার আগেই জমিটি পেয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের একটি আইনের অধীনে ওই সম্পত্তির অধিকার তার ছিল।
দীর্ঘদিন বেতনহীন ছুটিতে ছিলেন
২০২৫ সালের জুলাই থেকে সায়মা ওয়াজেদ প্রশাসনিক ছুটিতে ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তিনি প্রায় এক বছর বেতন ছাড়াই অবস্থান করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ না পাওয়া এবং বেতন না পাওয়ার কারণে তার আর্থিক ও মানসিক পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
সায়মা তার পদত্যাগপত্রে WHO মহাপরিচালক টেড্রোসের নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারানোর কথা জানান। তার অভিযোগ, তাকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং তিনি টেড্রোসের আচরণ নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি করলেও তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তিনি এটিকে হয়রানি ও চাপের অংশ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।
পদত্যাগের একদিন আগেই বরখাস্তের সুপারিশ
সায়মার পদত্যাগের বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ, WHO-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে—তার পদত্যাগের একদিন আগে সংশ্লিষ্ট কমিটি তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। অর্থাৎ, তার পদত্যাগ এমন এক সময়ে এসেছে যখন তার বিরুদ্ধে চলমান প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বরখাস্তের দিকেও এগোচ্ছিল।
WHO অবশ্য বলেছে, পুরো বিষয়টি যথাযথ প্রক্রিয়া ও ন্যায়সংগত পদ্ধতি অনুসরণ করেই পরিচালিত হয়েছে। সংস্থাটি সায়মার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চায়নি, কারণ বিষয়টি গোপনীয় তদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আলোচনায়
সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী পরিস্থিতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ২০২৪ সালের আগস্টে ব্যাপক আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার পরিবারের বিভিন্ন সদস্য ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অভিযোগে তদন্ত ও মামলা শুরু হয়।
সায়মা অবশ্য তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, তদন্তের সময় তার বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানো হয়েছে এবং এর ফলে তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এখন কী হবে WHO-এর নেতৃত্বে?
সায়মার পদত্যাগের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করবে WHO। এর মধ্যে ড. নিলেশ বুদ্ধ অন্তর্বর্তীকালীনভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের প্রক্রিয়া আগামী মাসগুলোতে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ শুধু একটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার শীর্ষ পদ থেকে একজন কর্মকর্তার বিদায় নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব, WHO-এর নিয়োগ ও জবাবদিহি ব্যবস্থা এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কীভাবে তদন্ত করা হয়—এসব প্রশ্নও নতুন করে সামনে এনেছে।



